সোমবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৯

যারা ছাত্র অবস্থায় বিয়ে করতে চায়, তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে


অনেক ছেলেই' আছে যারা 'শুধু প্রেমভালবাসার টানে নয় বরং ফিতনা এড়াতে কিংবা চরিত্র রক্ষার্থে ছাত্রবস্থায় বিয়ে করতে চান কিন্তু পরিবার সম্মত হয় না।
.
প্রথমত আমাদের সমাজে ছাত্রবস্থায় বিয়ে করতে চাওয়া টা বিরাট অপরাধ ধরা হয়। এই অসুস্থ্'য সমাজে' পাত্রীর' অভিভাবক স্বাভাবিক ভাবে কখনই একজন ছাত্র জামাই মেনে নিতে চান না, পাত্রীর অভিভাবক তো অনেক'' পরে, স্বয়ং পাত্রের ''অভিভাবকই ছাত্রবস্থায় ছেলেকে বিয়ে দিতে কোনভাবেই পছন্দ করেন না।
.
আফসোসের বিষয়, যেসব অভিভাবকের দ্বীনের বুঝ আছে, তারা সব জানে বুঝে তবুও এই এক জায়গায় আপত্তি — ছেলেকে ছাত্রাবস্থায় বা চাকরি পাবার আর্লি স্টেজে বিয়ে দিবেন না। এই পোস্টে কেবল ছেলের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে একজন সন্তান হয়েই, অন্যান্য সন্তানদের পক্ষ থেকে ছোট মুখে বড় কিছু কথা বলার আছে।
.
কারন অভিভাবক সাহায্য করলে বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যায়। আপনারাও পড়াশোনা করেছেন, আমাদের বয়স পার করে এসেছেন, দুনিয়াকে আমাদের থেকে বেশী দেখে এসেছেন আমরা স্বীকার করি এবং আপনাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করি।
এতে কোন সন্দেহ নাই আপনারা সন্তানের জন্য সব থেকে বেস্ট টা চান, সন্তানের ভালোর জন্য নিজেদের জীবনও উতসর্গ করতে পারেন।
.
কিন্তু এখনকার দুনিয়া আমরা যেভাবে দেখছি আপনাদের তা কল্পনারও বাইরে। এখন আমরা রাস্তায় বের হলেই ফিতনা, ভার্সিটি তে গেলে ফিতনা, ইন্টারনেটে ঢুকলে ফিতনা, ফেসবুকে ঢুকলে ফিতনা। এই অপরাধ গুলো করলে, কেউ সাক্ষী থাকবেনা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া, তাই আল্লাহ এর ভয় না থাকলে এই ফিতনা গুলো এড়িয়ে চলা কঠিন না, জাস্ট অসম্ভব।
.
দৃষ্টি সংযত কতদিকে করব? ডান দিকের ফিতনা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাম দিকে চোখ ঘুরালে বামদিকেও ফিতনা। জৈবিক চাহিদার ব্যাপারটা তো আছেই, এটা লজ্জার কিছু না স্বয়ং আল্লাহ তায়ালারই তা সৃষ্টি, কিন্তু মানসিক চাহিদা ও আধ্যাত্মিক চাহিদার ব্যাপার গুলোও ব্যাপক। বিপরীত লিংগের প্রতি মানুষের আকর্ষন স্বভাবজাত, মূলত জন্মজাত। একটা ছেলে তার যাবতীয় কথা কিন্তু অপর একটা ছেলের থেকে একটা মেয়েকে শেয়ার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং এটা স্বাভাবিক, বৈজ্ঞানিক ভাবেও স্বীকৃত, হরমনাল ব্যাপার।
.
আপনার ছেলে ভার্সিটিতে, রাস্তাঘাটে যথাসাধ্য দৃষ্টিসংযত রাখছে, ইন্টারনেটে ঢুকার সময় 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ..' — পড়ে ঢুকছে, আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে এত ভদ্র জীবন যাপন করছে, তাকে কী বিয়ের ব্যাপারে সহযোগিতা করে পথ সহজ করে দেওয়া আপনাদের উচিত নয়? অনেক সময় যে বিয়ের প্রয়োজন বোধ করলেও বলতে লজ্জা বোধ করে, আপনাদেরই উচিত তাকে জিজ্ঞাসা করে ব্যাপারটায় সহজ করে দেওয়া, তা না করলে অন্তত সে নিজে থেকে বলার পর সহজ করে দিন।
.
যে ব্যাক্তি চরিত্র রক্ষার্থে বিয়ে করতে চান, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাকে রিজিক সহ যাবতীয় ব্যাপারে সাহায্য করার ওয়াদা দিচ্ছেন, তাহলে অভিভাবক হয়ে কেন সাহায্যের ওয়াদা দিতে পারেন না? আল্লাহ তায়ালা র ওয়াদা কি যথেষ্ট নয়? আপনি বলতে চাচ্ছেন,চাকরি বাকরি কিছু একটা হোক। তারপর বিয়ে।
.
ওকে ফাইন, কিন্তু লজিক কী? যদি ছেলে বউ এর খাওয়া দাওয়াটাই একমাত্র ফ্যাক্ট হয়, তাহলে আপনারা অবশ্যই স্বীকার করবেন বাড়ির ৩/৪ জন সদস্যের রান্না করা খাবারে আর একজন এক্সট্রা থাকলে আনায়াসে হয়ে যায়। আর তাও যদি আপত্তি থাকে তাহলে নাহয় আপনার ছেলের খাবারের অংশ টুকু সে আর তার বউ ভাগা ভাগি করে খাবে ইনশাআল্লাহ। ছেলেবউ থাকবে স্বামীর ঘরেই, ঘুমোবে স্বামীর বিছানাতেই। কসমেটিক বা প্রাসংগিক কিছু খরচ তো আপনার মেয়ে থাকলে আপনিই করতেনই যথাসাধ্য।
.
আর আপনাকে তো সারাজীবন ছেলে বউ এর দায়িত্ব নিতে বলা হচ্ছেনা, কয়েকটা বছর, বড়জোর ২-৩ বছর। আল্লাহ এর সন্তুষ্টি এবং ছেলের ভালোর জন্য এটা কি খুব কষ্টসাধ্য?
.
যদি খাওয়া দাওয়া ফ্যাক্ট না হয়, ভাবেন যে ছেলের ক্যারিয়ারে এটা প্রতিবন্ধক, তাহলে জেনে রাখুন বিয়েটা ক্যারিয়ারে কোন প্রতিবন্ধক না। বরং সাপোর্টিভ। ছেলের শিক্ষাঙ্গনের উন্মুক্ত পরিবেশ, অবৈধ রিলেশনশিপের ব্যাপকতা ,অশ্লীলতা-বেহায়াপনা এগুলোই বরং ক্যারিয়ারের জন্য প্রতিবন্ধক, বিপজ্জনকও বটে।
.
ছাত্রবস্থায় বিয়ে করে ভালবাসার প্রিয় মানুষটি (স্ত্রী, বউ, জীবনসঙ্গিনী) আপনার সন্তানের কাছে থেকে ক্যারিয়ারের ব্যাপারে যখন উতসাহ দিবে, তখন সে পাবে একমুঠো পবিত্র ভালবাসার হৃদয়স্পর্শী উতসাহ, আর দায়িত্বশীলতা যখন ঘাড়ে চলে আসবে সে নিজে নিজেই ক্যারিয়ার গঠনে আরো উঠে পড়ে চেষ্টা করবে। বিয়ে করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা কোন প্রতিবন্ধকতাই নয়। বরং ভাল ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের বিশ্বস্ত সহযোগী।
.
হয়ত ভার্সিটি লাইফ শেষে এখন থেকে ২/৩ বছর পরে আপনার ছেলে বিয়ের সামর্থ্য লাভ করবে, কিন্তু এখন যদি আপনারা সাহায্য করেন তাহলে এই নশ্বর জীবনে কিন্তু তার 'মহামুল্যবান ২-৩ বছর নষ্ট হবে না, তার দ্বীনও অর্ধেক পূরন হবে, সে আপনাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ থাকবে। পরবর্তীতে তার সন্তান লাভ, আপনাদের দাদা দাদী হওয়া, নাতিপুতিদেরও বিয়ে শাদী ইত্যাদি সব বিষয় গুলোই ২-৩ বছর এগিয়ে গেল ইনশাআল্লাহ।
.
আর যেখানে রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন তবুও আপনাদের মন খুত খুত করে, সেক্ষেত্রে আরেকটা আইডিয়া আছে, বিয়ের পর ছেলে থাকল তার জায়গায়, বউ তার জায়গায়। দুইজনই আগের মত যেমন নিজের বাপের টাকায় চলছিল চলুক। বউ তার বাপের বাড়িতে কিংবা তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।দুজনেই ব্যস্ত পড়ালেখা নিয়ে।
.
এইদিকে নিজেদের মাঝে চ্যাটিং, ফোনালাপ, পারস্পারিক যোগাযোগ, খোঁজ খবর রাখা, উভয়ে উভয়ের পরিবারের সাথে কানেক্টিং থাকা, বিভিন্ন বন্ধে দেখা' সাক্ষাৎ করা, এক সাথে ভ্রমণ, খাওয়া-দাওয়া করা, উপহার দেয়া, উদ্দীপনামূলক প্রতিযোগিতা, ঈদে বাসায় নিয়ে আসা, তার বাড়ীতে যাওয়া, সৎ পরামর্শ দেয়া, সুখ-দুঃখে অংশীদার হওয়া ইত্যাদি চলল লেখাপড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
.
তবে হ্যাঁ এই রকম সিদ্ধান্তে ছেলে-মেয়েকে অবশ্যই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সেক্রিফাইসের মনোভাব ও অত্যধিক উচ্চাবিলাসী মনোভাব পরিহার করতে হবে দুই পরিবারেরই।
.
আর যদি এইসব কিছু্র কোনটাই কারন না হয়, নিছক সামাজিকতা রক্ষার দায় কিংবা মানুষ কী ভাববে সেটাি কারণ হয়, তাহলে প্রস্তুত থাকুন, আপনার সন্তান ফিতনায় পড়ুক, খারাপ কাজ করুক, অবৈধ যেকোন উপায়ে নিজের প্রয়োজন মেটাক, বা আপনাদের উপর তার মনে বিষন্নতা তৈরী হোক, আপনাদের ছেড়ে চলে যাক সে তো পাক্কা গুনাহগার হবে তবে এই গুনাহের শুরু করে দেওয়ার জন্য একটা অংশ নিতে আপনারাও প্রস্তুত থাকুন।
.
সে নিজেও জাহান্নামে তার জায়গা বানাবে আর আপনাদেরও টেনে নিয়ে যাবে।
..
তারপর আল্লাহ যেদিন আপনাদের পাকড়াও করবেন, প্রশ্ন করবেন, কিংবা ইহকালেই সন্তান রিলেটেড বড় কোন বিপদের সম্মুখীন হবেন, তখন আপনার কোন সমাজ আপনাকে রক্ষা করবে? আপনার হয়ে আল্লাহ তায়ালা কে উত্তর দেবার সাহস করবে? বিয়ের কথা বলার নির্লজ্জ্ব ভঙ্গিটা পাপ না,কিন্তু নির্লজ্জ্ব পথ তৈরি করে দেয়া, ঐ পথে হাটতে দেয়াটা পাপের।
.
'জন্ম - মানুষ কী ভাববে - মৃত্যু' — এইভাবেই জীবনটা পার করে দিয়েন না। আল্লাহ বুঝার তৌফিক দিন।

মহিউদ্দিন মুহাম্মদ

জ্বীন জাতির রহস্যময় ইতিহাস


জ্বিনরা কেমন, কি খায়, তাদের জীবন যাত্রা কি রকম তারা কোথায় থাকে এ বিষয় আমাদের কৌতুহাল সব সময় একটু বেশি। এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য আছে। জানা যায়, জ্বিন একটি প্রাণী। ইবলিস বা শয়তানও জ্বিনের অর্ন্তভুক্ত। তাদের কৃতকর্মের বিচার হবে। তাদের প্রকৃতি ও ক্ষমতা মানুষের থেকে ভিন্ন। তারা যেকোনো আকৃতি ধারণ করতে পারে। যা মানুষ পারে না। এ ধরণের ক্ষমতা দিয়েই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। নিন্মে জ্বিনের আদ্যপান্ত তুলে ধরা হলো-

জ্বিন শব্দের অর্থ ও পরিচিতি:

জ্বিনজাতি মানুষের থেকে আলাদা এক সৃষ্টি। জ্বিন শব্দের অর্থ:

গুপ্ত, অদৃশ্য, লুক্কায়িত, আবৃত ইত্যাদি। জিন্নি একবচন আর জ্বিন বহুবচন।

জ্বিন কিসের তৈরি:

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেন, আমি আদমের আগে জ্বিনকে সৃষ্টি করেছি ‘লু’-এর আগুন (অর্থাৎ ধোয়াবিহীন আগুনের শিখা) হতে। (সূরাহ আল-হিজর: আয়াত ২৭) (সূরা আর-রহমান: আয়াত ১৫) (সূরাহ আল-আ‘রাফ: আয়াত ১২)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফিরিশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে অনুপম জ্যোতি (নুর) দিয়ে, জ্বিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে (মিম মা-রিজিম মিন নার) ধোয়াবিহীন আগুনের শিখা দিয়ে এবং আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে তাই দিয়ে যার কথা (কুরআনুল কারীমে) তোমাদের বলা হয়েছে (অর্থাৎ মাটি)। (সহীহ মুসলিম, মিশকাতুল মাসাবিহ হা/৫৭০১)

জ্বিন জাতিকে কখন সৃষ্টি করা হয়েছে:

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জ্বিন জাতিকে মানুষের পূর্বেই সৃষ্টি করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কালো পচা শুষ্ক ঠনঠনে মাটি হতে। আর এর পূর্বে জ্বিনকে সৃষ্টি করেছি ধোয়াবিহীন আগুনের শিখা হতে। (সূরা হিজর, আয়াত ২৬-২৭)।

জ্বিনদের প্রকার ভেদ:

নবী (সা.) বলেছেন, জ্বিন তিন শ্রেণির। এক শ্রেণির ডানা আছে, তারা তার সাহায্যে বাতাসে উড়ে বেড়ায়, এক শ্রেণি সাপ-কুকুরের আকারে বসবাস করে, আর এক শ্রেণি স্থায়ীভাবে বসবাস করে ও ভ্রমণ করে। (ত্ববরানীর কাবীর, হা/৫৭৩; হাকেম, হা/৩৭০২, সহীহুল জামে লিল আলবানী, হা/৩১১৪)।

কোনো প্রাণী জ্বিনকে দেখতে পারে:

মানুষ সচরাচর জ্বিন দেখতে পায় না। কিন্তু কিছু জীব-জন্তু যেমন- গাধা ও কুকুর জ্বিন দেখতে পায়। নাবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনবে, তখন আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। কারণ সে কোনো ফিরিশতা দেখেছে। আর যখন তোমরা গাধার ডাক শুনবে, তখন আল্লাহর নিকট শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। কারণ সে কোনো শয়তান দেখেছে।’ (সহীহুল বুখারী, হা/৩৩০৩ সহীহ মুসলিম, মাশা হা/৭০৯৬ মিশকাত, মাশা হা/১৪১৯)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‌‘যখন তোমরা কুকুর ও গাধার ডাক শুনবে, তখন আল্লাহর নিকট (শয়তান থেকে) আশ্রয় প্রার্থনা কর। কারণ তারা তা দেখতে পায়, যা তোমরা দেখতে পাও না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হা/৪২৫৬)।

জ্বিন ও ফিরিশতার মধ্যে পার্থক্য:

১. জ্বিন আগুনের সৃষ্টি, কিন্তু ফিরিশতা নুর থেকে সৃষ্টি।

২. জ্বিন পানাহার করে, কিন্তু ফিরিশতা পানাহার করেন না।

৩. জ্বিন পাপ-পুণ্য করে, কিন্তু ফিরিশতা কেবল পুণ্য করেন এবং সর্বদা মহান আলাহর ইবাদত ও আনুগত্য করেন। দুটিই অদৃশ্য জগৎ কিন্তু উভয় জগৎ ভিন্ন ভিন্ন।

শয়তান জ্বিন সম্প্রদায় ভুক্ত:

মহান আল্লাহ বলেন, (স্বরণ কর) আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ছাড়া সবাই সিজদা করল, (কানা মিনাল জ্বিন) সে ছিল জ্বিনদের একজন। সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। (সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫০)।

শয়তানের আকৃতি:

শয়তানের আকৃত যেমন কুৎসিত তেমনি শক্তিতেও সে জ্বিনদের মধ্যে সবার চাইতে বেশী বলবান। উবাই বিন কাব (রা.) হতে বর্ণিত, তাঁর এক খেজুরের খামার ছিল। সেখানে হতে খেজুর কম হয়ে যাচ্ছিল। তাই এক রাত্রিতে তিনি পাহারা দিয়ে থাকলেন। হঠাৎ তিনি নব্য তরুণের ন্যায় এক জন্তু দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সালাম দিলেন, সে তাঁর সালামের উত্তরও দিল। তিনি তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কে তুমি? জ্বিন অথবা ইনসান?’ সে বলল, ‘আমি জ্বিন’। তিনি বললেন, কৈ তোমার হাতটা আমাকে দেখতে দাও। সে তার হাত দেখতে দিল। তার হাত ছিল কুকুরের পায়ের মত। তার দেহের লোমও ছিল কুকুরের মতো। তিনি সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, জ্বিনের সৃষ্টিগত আকৃতি কি এটাই? সে বলল, জ্বিনরা জানে যে তাদের মধ্যে আমার চেয়ে অধিক বলবান পুরুষ আর কেউ নেই। তিনি বললেন, এখানে কী জন্য এসেছ? সে বলল, আমরা খবর পেলাম যে, তুমি দান করতে ভালবাস। তাই তোমার খাদ্যভান্ডার হতে কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা তোমাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় কী? সে বলল, (উপায়) সূরা বাক্বারার এই আয়াত পাঠ (আল্লাহু লা ইলা-হা ইল্লাহ হুয়াল হাইয়্যূল কাইয়্যু,। যে ব্যক্তি সন্ধায় তা পাঠ করবে সে সকাল অবধি আমাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে। আর যে ব্যক্তি সকালে তা পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে।

অতঃপর সকাল হলে তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নিকট এসে রাত্রের বৃত্তান্ত উল্লেখ করলেন। তা শুনে তিনি বললেন, ‘খবীস সত্যই বলেছে’।(সুনান আন নাসাঈ, ত্বাবারাণী, সহীহ তারগীব, হা/৬৬২)।

জ্বিনদের খাবার ও পানীয়:

জ্বিনেরা খাবার খায়। রাসূল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যখন কেউ আহার করে তখন যেন ডান হাত দিয়ে আহার করে এবং পান করার সময় যেন ডান হাত দিয়েই পান করে- কেননা শয়তান আহার করে বাম হাতে ও পানাহার করে বাম হাতে (সহীহ মুসলিম, হা/১০৫, ৩৭৬৪)।

একবার নবী (সা.) আবু হুরাইরা (রা.)-কে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ঢেলা আনতে বললেন এবং হাড় ও শুকনো গোবর আনতে নিষেধ করলেন। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘এ দুটি জ্বিনদের খাদ্য’। (সহীহুল বুখারী, তাও হা/৩৮৬০)

অন্যত্র তিনি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা গোবর বা হাড় দ্বারা পেশাব-পায়খানা পরিস্কার করো না, কারণ তা তোমাদের জ্বিন ভাইদের খাদ্য’ (সহীহ আত-তিরমিযী, হা/১৮)

আল্লাহর নাম নিয়ে (বিসমিল্লাহ অথবা সালাম দিয়ে) গৃহে প্রবেশ করলে সে ঘরে শয়তান ও তার অনুচরেরা প্রবেশ করতে পারে না। বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করলে সে খাবারে শয়তান ও তার অনুচরের কোন অংশ থাকে না। (সহীহ মুসলিম, হা/৫৩৮১)

হুযাইফা (রা.) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে যখন আমরা কোনও খানার মজলিসে হাজির থাকতাম তখন তিনি (সা.) শুরু না করা পর্যন্ত আমরা কেউ-ই খাবারে হাত দিতাম না। একবারের ঘটনা। আমরা (রাসূলুলাহ সা. এর সঙ্গে) খাওয়ার মজলিসে হাযির আছি। এমন সময় এক বেদুইন এল। যেন তাকে কেউ খাবারের দিকে তাড়িয়ে এনেছে। সে এসেই খাবারের দিকে হাত বাড়াল। রাসূলুলাহ (সা.) তার হাত ধরে ফেললেন এবং তাকে বসিয়ে দিলেন। তারপর একটি মেয়ে (বালিকা) এল, তাকেও যেন হাঁকিয়ে আনা হলো। মেয়েটি এসে খাবরের পাত্রে হাত দিতে উদ্যত হলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) তারও হাত ধরে ফেললেন। অতপর তিনি (সা.) বললেন, যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, শয়তান তা নিজের জন্য হালাল করে নেয়। শয়তান এই বেদুঈনের সাথে খেতে এসেছিল। আমি তার হাত ধরে ফেললাম। তাই সে (শয়তান) ফের এই মেয়েটির সাথে এল এবং এর মাধ্যমে খাবারে ভাগ বসাতে চাইলে। এর হাতও আমি ধরে ফেললাম। যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার কসম! এই দুজনের হাতের সাথে শয়তানের হাতও আমার মুঠোর মধ্যে (সুনানে আবু দাউদ, হা/৩৭৬৬)

জ্বিনদের বিবাহ ও বংশবৃদ্ধি:

জ্বিনদের মধ্যে বিবাহ-শাদী ও বংশবৃদ্ধি হয়ে থাকে। শয়তানের বংশধর আছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,‘(স্মরণ কর) আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলিশ ছাড়া সবাই সিজদা করলো। (কানা মিনাল জ্বিন) সে ছিল জ্বিনদের একজন। সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল, তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে (জুররিয়াতাহু) অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু? সীমালংঘনকারীদের পরিনাম কত নিকৃষ্ট। (সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৫০)

জ্বিন-ইনসানের আপোসে মিলন কি সম্ভব? এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে এখতেলাফ রয়েছে। ইমাম সুয়ূতী, ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) সহ আরোও অনেকে জ্বিন-ইনসানের মাঝে বিবাহ ও মিলন ঘটতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে অন্য কিছু উলামা বলেন, জ্বিন-ইনসানের মাঝে বিবাহ ও মিলন সম্ভব নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ মানুষের নিজেদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করে অনুগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাস ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্পদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (সূরা আর রূম, আয়াত: ২১)

জ্বিনদের বয়স ও মৃত্য:

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জ্বিন ও শয়তানের মৃত্যু আছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সূরা আর-রহমানের ২৬-২৭ নম্বর আয়াতে বলেন: (কুল্লু মান ‘আলাইহা ফান) ‘ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল বা সত্তা’

তাদের গড় আয়ু কত, সে বিষয়ে কোন তথ্য জানা নেই। তবে জ্বিনের একটি অংশ বা ইবলিশ সম্বন্ধে মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, সে কিয়ামত অবধি জীবিত থাকবে। (সূরা আরাফ, আয়াত: ১৪; সূরা আল হিজর, আয়াত: ৩৬; সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৭৯; সূরা আল আরাফ, আয়াত: ১৫)

তারা যে মরে এবং তাদের হত্যা করা যায়, তার প্রমাণ খালেদ বিন অলীদ (রা.) উযযার শয়তানকে হত্যা করেছেন এবং মদীনার এক সাহাবী সাপরূপী এক জ্বিনকে হত্যা করেছেন।

জ্বিন ও শয়তানের বাসা:

সহীহ হাদীসে আছে, শয়তান কোথাও বিশ্রাম নেয়। অতঃপর অন্ধকার ছেয়ে এলে তারা ছড়িয়ে পড়ে। এই জন্য নাবী (সা.) সেই সময় শিশুদেরকে ঘরের বাইরে যেতে দিতে নিষেধ করেছেন। (সহীহুল বুখারী, তাও হা/৩২৮০) শয়তান আযান শুনে পলায়ন করে। শয়তানদেরকে রামাদ্বান মাসে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

অর্ধেক শরীর রোদে ও অর্ধেক ছায়াতে রেখে বসতে শয়তান ভালবাসে। এই জন্য নাবী (সা.) আমাদেরকে অনুরূপ বসতে নিষেধ করেছেন। (মুসনাদে আহমদ, সিলসিলা সহীহা, হা/৮৩৮)

এমন পশু যার সাথে শয়তান থাকে:

হাদীসে এসেছে ‘কালো কুকুর শয়তান’ অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে ‘উট শয়তানী উপাদান থেকে সৃষ্ট’ (সহীহ মুসলিম, হা/২৬৫, সুনানে আবু দাউদ, সুনান আত-তিরমিযী, সুনান আন-নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাযাহ; সহীহা, হা/১৫৭৯)

জ্বিন জাতীর ক্ষমতা ও অক্ষমতা:

১. জ্বিনদের মহাকাশ অভিযান:

শয়তান জ্বিনেরা মহাকাশে আরোহণ করে আসমানী খবর চুরি করে শুনতে চায়। যাতে তারা ঘটনা ঘটার পূর্বে জানতে পারে। কিন্তু সর্বশেষ নবী প্রেরিত হওয়ার পর মহাকাশের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা হয়। তাদের বিশ্বাসী এক দলের কথা- ‘আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, কঠোর প্রহরী ও উল্বাপিন্ড দ্বারা তা পরিপূর্ণ। আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে (সংবাদ) শুনবার জন্য বসতাম, কিন্তু এখন কেউ (সংবাদ) শুনতে চাইলে, সে তার উপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপিন্ডের সম্মুখিন হয়। (সূরা জ্বিন- ৭২: ৮-৯)

কিছু শয়তান সেই খবর পৃথিবীতে তাদের সহচর গণকদের মনে পৌঁছে দেয়। গণকরা তাদের অনুমান ও ধারণার আরো শত মিথ্যা জুড়ে বিশদভাবে প্রচার করে। ফলে যা সত্য তা সত্য ঘটে, কিছু আন্দাজও সঠিক হয়ে যায় এবং অধিকতরই মিথ্যা ও অবাস্তব। (সহীহুল বুখারী, তাও হা/৪৭০১; সহীহ মুসলিম, হা/৫৯৫৫; এরুপ বর্ণনা আরো পাবেন সহীহুল বুখারী, তাও হা/৫৭৬২; ৩২১০)

মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আকাশে আমি গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি করেছি এবং ওকে করেছি দর্শকদের জন্য সুশোভিত। প্রত্যেক অভিশপ্ত শয়তান হতে আমি ওকে নিরাপদ রেখেছি। আর কেউ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে ওর পেছনে ছুটে প্রদীপ্ত আগ্নিশিখা (উল্কা)। (সূরা আল হিজর- ১৫: ১৬-১৮)

২. জ্বিনদের শিল্পজ্ঞান:

এ ব্যাপারে বহু যুগ পূর্বে নবী সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে জ্বিনেরা বহু শিল্পকর্ম প্রদর্শন করেছে। (সূরা সাবা- ৩৪: ১২-১৩)

৩. জ্বিনদের স্বেচ্ছারূপ ধারণ করার ক্ষমতা:

জ্বিনেরা স্বেচ্ছামতো রূপ ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। কখনো মানুষ, আবার কখনো কোন জীব-জন্তুর আকারে মানুষের কাছে আবির্ভূত হয়। বদরের দিন শয়তান সুরাকা বিন মালেকের রূপ ধারণ করে মুশরিকদের নিকট এসেছিল এবং বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিল। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হল এবং অবতীর্ণ ফিরিশতা দেখতে পেলে সে পালিয়ে যায়। মহান আল্লাহ সে কথা কুরআনে বলেছেন, “স্মরণ কর, শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করেছিল এবং বলেছিল, আজ মানুষের মধ্যে কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হবে না, আর আমি অবশ্যই তোমাদের সহযোগী (প্রতিবেশী)। অতঃপর দু‘দল যখন পরম্পরের সম্মুখীন হল, তখন সে পিছু হটে সরে পড়ল ও বলল, নিশ্চয় তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। নিশ্চয় আমি তা দেখি, যা তোমরা দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমি আলাহকে ভয় করি। আর আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। {সূরা আল আনফাল- ৮: ৪৮}

৪. ‘কালো কুকুর শয়তান’ (সহীহ মুসলিম, মাশা হা/১১৬৫)

৫.গৃহবাসী সাপ জ্বিন:

জ্বিন কখনো কখনো সাপের আকৃতি ধারণ করে মানুষেন বাসায় বসবাস করে। এ জন্য নবী (সা.) বাড়ির ভিতর তাড়াহুড়া করে সাপ হত্যা করতে নিষেধ করেছন। যাতে কোন মুসলিম জ্বিন অকারণে মারা না যায়। তিনি (সা.) বলেছেন, ‘অবশ্যই মদীনায় কিছু জ্বিন আছে, যারা মুসলমান হয়েছে। সুতরাং তাদের কাউকে (সাপ আকারে) দেখলে তাকে তিন বার সর্তক কর। অতঃপর উচিত মনে হলে তাকে হত্যা কর। কারণ সে শয়তান। (সহীহ মুসলিম, হা/৫৯৭৬)

বিশ্বব্যবস্থা মানবাধিকার ও মারণাস্ত্রের কারবারিরা


মানবাধিকার ও মারণাস্ত্রের কারবারিরা

এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা—পৃথিবীর যে প্রান্তেই গণতন্ত্র বা মানবিকতা যখন বিপন্ন হয়, তা নিয়ে সরব হয় আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো। তাদের চোখে নিজ স্বার্থে গণতন্ত্র ও মানবিকতা বিপন্ন হলে শুধু ওই সব দেশের সরকারই নয়, ইউরোপ-আমেরিকার নানা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান উচ্চকণ্ঠে সমালোচনায় সরব হয়। তবে একটি বিষয়ে এসব দেশে সরকার ও সংগঠনগুলো মোটেও সরব হয় না, সেটি হলো তাদের সমরাস্ত্র ব্যবসা ও তাদের দ্বারা অহরহ বিশ্ব মানবিকতা লঙ্ঘনের ঘটনা।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, আধিপত্যবাদ, নিজেদের মধ্যে হানাহানি এখন ইতিহাস। সুষম সমাজব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিংশ শতাব্দীতে যে সামাজিক বিপ্লব ঘটেছিল, শতাব্দী শেষে ওই ব্যবস্থাগুলোর পতন ঘটেছে। সমতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য আপাতত ‘লোকান্তরিত’। একবিংশ শতাব্দীর যাত্রা শুরু হয়েছে পুঁজির বিশ্বায়ন বা শাসন, শোষণ ও আধিপত্যবাদের নতুন কৌশল দিয়ে। ঔপনিবেশিক যুগে পশ্চিম ইউরোপ পৃথিবীজুড়ে তাদের উপনিবেশ-দখলদারি দিয়ে পৃথিবীর ভাগ্যনিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর আজকের বিশ্ব পুঁজির নিয়ন্ত্রক হয়েছে ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

সম্প্রতি স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বিশ্বের বড় বড় সমরাস্ত্র বিক্রেতা ও ক্রেতা দেশ নিয়ে একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারা তাদের সর্বশেষ গবেষণায় জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী অস্ত্র ব্যবসা এখন খুবই রমরমা এবং বিক্রেতাদের তালিকা দেখলে প্রথমেই আসবে আমেরিকা আর ইউরোপের নাম। সারা বিশ্বের অস্ত্র রপ্তানি বাণিজ্যের তিন-চতুর্থাংশই করে পাঁচটি দেশ। দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি 

ও চীন। এই পাঁচটি দেশ ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের নানা দেশে ৭৫ শতাংশ অস্ত্রের জোগান দিয়েছে।

সুইডিশ সংসদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটটি জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সামরিক বিষয়ে তথ্য, বিশ্লেষণ, সুপারিশসহ বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ ও মিডিয়ায় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করছে। এই ইনস্টিটিউট মূলত সুইডিশ সরকারের অর্থায়নে চালিত। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তারা সমরাস্ত্রবিষয়ক গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশ করে থাকে। সদ্য প্রকাশিত গবেষণার মতে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসা বিগত পাঁচ বছরের (২০০৯ থেকে ২০১৩) তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে মানুষ নিধনকারী এই মারণাস্ত্রের ক্রেতা কারা! সর্বোচ্চ পাঁচটি ক্রেতা দেশ হলো সৌদি আরব, ভারত, মিসর, অস্ট্রেলিয়া ও আলজেরিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো গত পাঁচ বছরে অস্ত্র আমদানি প্রায় দ্বিগুণ করেছে। মারণাস্ত্র বিক্রির তালিকায় থাকা ১ নম্বর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ অস্ত্রের জোগানদাতা। এদের অর্ধেকেরও বেশি অস্ত্রের ক্রেতা মধ্যপ্রাচ্য। তবে পৃথিবীর ৯৮টি দেশ বিগত পাঁচ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রযুক্তির মানববিধ্বংসী এসব অস্ত্রের মধ্যে যুদ্ধবিমান, স্বল্প পরিসীমার মিসাইল, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ইত্যাদির চাহিদা ক্রেতা দেশগুলোর কাছে বেশি।

এই মুহূর্তে রাশিয়া পৃথিবীর অস্ত্র বিক্রির তালিকায় ২ নম্বরে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে তাদের অস্ত্র বিক্রির হার ২১ শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ তালিকায় থাকা ফ্রান্স ও জার্মানি যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮ এবং ৬ দশমিক ৪ শতাংশ অস্ত্রের বিক্রেতা। চীন পৃথিবীর ষষ্ঠ অস্ত্র বিক্রয়কারী দেশ, তারা গত পাঁচ বছরে (২০১৪-২০১৮) পৃথিবীর বিক্রীত অস্ত্রের ৫ দশমিক ২ শতাংশের বিক্রেতা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাদের গবেষণায় পরিষ্কার করে বলছে, বিশ্বের প্রধান অস্ত্রের জোগানদাতা ইউরোপ ও আমেরিকা।

বিশ্বে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, যুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ, শরণার্থী, জাতিগোষ্ঠী ইত্যাদি বিষয় দেখভালের জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকেই মানবাধিকারবিষয়ক ছয়টি সংগঠন রয়েছে। এসব সংস্থায় বিভিন্ন দেশের সদস্যরা থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মুরব্বি ওই অস্ত্র বিক্রেতা দেশগুলোই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোটেও এ ধরনের বেশ কিছু কমিটি রয়েছে। ইউরোপের নানা দেশে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল বা দেশভিত্তিক সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এ ছাড়া তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোতেও অঞ্চল বা দেশভিত্তিক ডেস্ক রয়েছে। সংসদীয় কমিটি ও অঞ্চলভিত্তিক ডেস্কগুলো বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচন প্রভৃতি বিষয় পর্যবেক্ষণ করে এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে থাকে।

এসবের বাইরে ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে শতাধিক বেসরকারি সংগঠন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সামাজিক বৈষম্য, আইন ও অধিকার, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, জলবায়ু, শিশু ও নারী অধিকার, বাক্‌স্বাধীনতা, শিক্ষা, স্বাবলম্বিতাবিষয়ক কাজ করছে। এসব বেসরকারি সংগঠন অনেক ক্ষেত্রেই সদস্যদের চাঁদা, অনুদান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সরকারি সাহায্য পেয়ে থাকে। এসব সংগঠনের অনেক সদস্য আবার স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকে। তারা বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোয় নানা ধরনের সেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ করছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় দেশগুলোর বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট বা ইউরোপ-আমেরিকার বেসরকারি সংগঠনগুলো একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা বা গবেষণা করে না। আর তা হলো ইউরোপ-আমেরিকার বিক্রীত ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র দিয়ে পৃথিবীর কত জনপদ ধ্বংস হয়েছে, কত সম্পদ নষ্ট হয়েছে এবং কত মানুষ গৃহহারা বা মৃত্যুবরণ করেছে। অসত্য ও ভুল যুক্তিকে সামনে এনে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার নামে কত দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দিয়েছে।

একসময় ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও দখলদারি দিয়ে বিশ্ব পুঁজি লুণ্ঠন করেছে। তারা আজ মারণাস্ত্রের বড় কারবারি। তারাই আবার বিশ্বে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। তবে এসব পুঁজিবাদী দেশের জনগণের সবাই পুঁজিবাদের বাহক—এই বিশ্লেষণও সঠিক নয়। এসব দেশেও বহু সংগঠন ও বিশালসংখ্যক মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের রাষ্ট্রগুলোর নানা মানবিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন। তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ এবং বিশ্বের মানুষের অধিকার ও মানবিকতার জন্য লড়াই করছেন।
লেখক
সরাফ আহমেদ